Follow Us @soratemplates

Tuesday, 31 December 2019

শুভ নববর্ষ,"আসুন প্রতিজ্ঞা করি আজ থেকে আর কোন মানুষের ক্ষতি করব না"

12:47 0 Comments
নাজমুল হাসান নিরবঃ
আসসালামু আলাইকুম? কেমন আছেন সবাই?আশা করি ভালো।আরেকটি বছরের সমাপ্তি।আমাদের প্রত্যেক জনের জীবন থেকে একটি বর্ষ হারিয়ে গেলো।বয়সেও এক বছর ছোট হয়ে গেলাম।তারপর নতুন একটি বর্ষ আসলো, ১৯ এর পরিবর্তে  ২০ লিখতে হবে,তাই শুভ ইংরেজি  নববর্ষ! বাড়ির পাশে দুড়ুম দুড়ুম সাউন সিস্টেম এর আওয়াজ হচ্ছে।দুপুরের দিকে বাড়ি থেকে শহড়ের দিকে গিয়েছিলাম। যাত্রাপথে তেমন চোখে পড়েনি তবে আসার পথে চোখে পড়ল মোড়ে মোড়ে আলোকসজ্জা আর সাউন্ড সিস্টেমে হিন্দি গানের বাজনা।কিন্তু তেমন কোন লোকজন নেই।সাথে থাকা ছোটভাইকে জিগ্যেস করলাম এতো আয়োজন লোকজন কই?সে জানালো লোকজন রাত্রে আসবে,তারপর নাচ-গান, খাওয়া-দাওয়া এছাড়া নাকি নানান নেশা জাতীয় দ্রব্য ও  থাকে।

যাইহোক মূল কথায় আসি, নতুন বছর আসছে নতুন উদ্যোমে, উদ্যোগে ভূল গুলো সংশোধন করে নতুন করে শুরু করতে হবে?! সেরকমই তো হওয়ার কথা। কিন্তু সেটা কি হচ্ছে?শুরুইটা তো হচ্ছেই ভূল দিয়ে! অন্যায় দিয়ে!তাহলে সামনে কি করবেন?তাহলে কি সারা বছরটা অন্যায় করেই চলবে??..সিস্টেমেতো তাই আসে।

বন্ধুরা জন্মের পর থেকে সৃষ্টিকর্তা,পরিবার,সমাজ, দেশ থেকে আমরা কতই না পেয়েছি।একবার চিন্তা করেনতো এই পরিবার, সমাজ, দেশ যদি পাশে না থাকত তাহলে আমাদের আজকের এই অবস্থানে আসতে কি সম্ভব হতো?

এখন আসেন এই পরিবার, সমাজ, দেশ, জাতি এখান থেকে আমারা জীবন ব্যাবস্থার সবকিছু যদি পেয়ে থাকি তাহলে তার কাছে কি আমরা ঋণী নয়??
 তাহলে আমাদের তো আমাদের ঋণ  শোধ করতে হবে।
সেটা কিভাবে?

অবশ্যই একজন সুনাগরিক হয়ে।

একজন সুনাগরিক ই পারে পরিবার, সমাজ,দেশ, জাতির উপকারে আসতে।

আমরা যে ভাবে সুনাগরিক হতে পারি!

সুনাগরিকের দায়িত্ব ও কর্তব্যঃ
সুনাগরিকের প্রধান কর্তব্য হচ্ছে রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত্য প্রকাশ করা। অর্থাৎ রাষ্ট্রের নির্দেশ মেনে চলা। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, অখন্ডতা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুন্ন রাখার জন্য প্রত্যেক সুনাগরিককে সর্বদা সজাগ এবং চরম ত্যাগের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

রাষ্ট্রের প্রচলিত আইন এবং সংবিধান মেনে চলা এবং আইনের প্রতি সম্মান দেখানো সুনাগরিকদের অন্যতম দায়িত্ব। কেউ আইন অমান্য করলে সমাজে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। স্বাভাবিক জীবনের ব্যাঘাত ঘটে। তাই সুষ্ঠু জীবনযাপন, শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রত্যেক সুনাগরিককে আইন মেনে চলতে হবে।

সততা ও সুবিবেচনার সাথে ভোট দেওয়া সুনাগরিকের পবিত্র দায়িত্ব ও কর্তব্য। এর ফলে যোগ্য ও উপযুক্ত প্রার্থী জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হবে। অযোগ্য ও দুর্নীতিবাজ প্রার্থীকে ভোটদানে বিরত থাকা উচিত।

রাষ্ট্রীয় আয়ের প্রধান উৎস সুনাগরিকদের প্রদেয় কর ও খাজনা, রাষ্ট্রের প্রশাসনিক, প্রতিরক্ষা এবং উন্নয়নমূলক কাজ সম্পাদনের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন। সুনাগরিকদের যথাসময়ে কর প্রদান করে রাষ্ট্রীয় কাজে সহযোগিতা করতে হবে।

রাষ্ট্রের অর্পিত দায়িত্ব অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করা সুনাগরিকের কর্তব্য। সরকারের গৃহীত কোনো কাজ মানে হলো জনগণের কাজ। সরকারি কর্মকর্তা তদুপরি সুনাগরিকদের সততা ও কাজে একাগ্রতা ও নিষ্ঠার উপর সরকারের সফলতা, উন্নতি ও অগ্রগতি নির্ভর করে।

প্রতিটি শিশুই রাষ্ট্রের নাগরিক। পিতামাতা তার অভিভাবক হিসেবে কাজ করেন। তাই সন্তানদের জীবনরক্ষার জন্য বিভিন্ন প্রতিষেধক টীকাদান, সুস্থসবল রাখা এবং নির্দিষ্ট সময়ে স্কুলে পাঠানো পিতামাতার দায়িত্ব। এতে করে সন্তান সুশিক্ষিত হয়ে সুনাগরিক হয়ে গড়ে উঠবে এবং পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে অবদান রাখবে।

প্রত্যেক সুনাগরিককেই দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ থাকতে হবে। নিজস্ব সংস্কৃতি, রাষ্ট্রীয় অর্জন ও সফলতা এবং সবসময় দেশের মঙ্গল কামনা করা নাগরিকদের কর্তব্য। জাতীয় সংগীত, জাতীয় ইতিহাস, জাতীয় বীর ও মনীষীদের অবদানকে স্মরণ করতে হবে।

প্রত্যেক সুনাগরিককে একে অপরকে সহ্য করার ক্ষমতা থাকতে হবে। ভিন্নমতকে মূল্যায়ন করা এবং সম্মান করার মধ্য দিয়ে জাতীয় সংহতি অর্জন করা সম্ভব। এটা প্রত্যেককেই বিশ্বাস করতে হবে যে বৈচিত্র্যের মধ্যেই সৌন্দর্য নিহিত।

প্রত্যেক সুনাগরিককেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে হবে। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের এমনকি রাষ্ট্রের বেআইনী কোন কাজের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো সুনাগরিকদের নৈতিক দায়িত্ব। তবে কোনক্রমেই আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া যাবে না। তাহলেই সুশাসন এবং দুর্নীতিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা হবে।

এছাড়া নিয়মিত সৃষ্টিকর্তার আনুগত্য প্রকাশ করা,মা-বাবার সেবা করা,পাড়া-প্রতিবেশীর খোজ খবর নেওয়া তাদের বিপদেআপদে পাশে থাকা,গরীব দুঃখীদের সাহায্য সহযোগীতা করা একজন সুনাগরিক এর নৈতিক দায়ীত্ব।


শেষকথাঃ আজকে আমার প্রীয় কিছু ব্যাক্তিবর্গ আমাকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন তাদেরকে ও আমার আন্তরিক শুভাচ্ছা।
তবে আপনাদের কাছে আমার একাটা চাওয়া আছে।আর সেটা হলো "আসুন আজকে আমরা প্রতিজ্ঞা করি এখন থেকে মৃত্যুর শেষ মুহূর্ত  পর্যন্ত মানুষের কোন  ক্ষতি করব না"।।

আর যদি এটা করতে পারেন তাহলে পরিবার, দেশ, জাতি, সমাজ উপকৃত হবে।।

©nazmulnirob.com





Sunday, 29 December 2019

নৈতিক শিক্ষা প্রতিটা ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক হয়ে পড়েছে।।

12:21 0 Comments
নাজমুল হাসান নিরব,
শিক্ষা ও নৈতিকতা একটির সাথে অন্যটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শিক্ষা একজন ব্যক্তিকে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে আসে। আর নৈতিকতা মানুষের জীবনকে সুন্দর ও সমৃদ্ধ করে তোলে। এ দুটির সমন্বয় হলে একজন মানুষ সৎ, চরিত্রবান, আল্লাহভীরু, দেশপ্রেমিক ও দায়িত্বশীল হয়ে উঠে। যার ফলে বর্তমান সমাজের জন্য নৈতিক শিক্ষা অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষা: মানুষের মৌলিক অধিকারের অন্যতম একটি হল শিক্ষা। শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে- Education is the backbone of a nation. শিক্ষাহীন জাতি মেরুদণ্ডহীন প্রাণির মতো। অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে নিজের জীবনে সফলভাবে প্রয়োগ করাকে শিক্ষা বলে। এ শিক্ষা মানুষকে প্রকৃত মানুষ হতে সাহয্যে করে এবং মানব হৃদয়কে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে মুক্ত করে জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত করে। John Milton এর মতে- “Education is the harmonious development of body,  mind and soul.’’ এখানে শিক্ষা বলতে বিশেষভাবে ইসলামী শিক্ষাকে বোঝানো হয়েছে। আর যে শিক্ষাব্যবস্থায় ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ ও পরিপূর্ণরূপে তুলে ধরা হয়েছে তাকে ইসলামী শিক্ষা বলে।
আজ আমাদের সমাজে নৈতিক শিক্ষার সঠিক প্রয়োগ না থাকায় অপরাধ প্রবণতা বেড়েই চলছে। অনৈতিকতার প্রভাবে নৈতিকতা প্রায় বিলুপ্ত। পিতা-মাতা পাচ্ছে না তাদের সেবা, সন্তান পাচ্ছে না তাদের অধিকার, শিক্ষক পাচ্ছে না তাঁর সম্মান, ছাত্র পাচ্ছে না সঠিক শিক্ষা। এভাবে খুঁজতে গেলে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অসংখ্য অন্যায় চোখের সামনে ফুটে উঠবে। যার একটাই কারণ, নৈতিক শিক্ষার অভাব এবং ইসলামকে নিছক ধর্ম হিসেবে গ্রহণ করা। Islam is not only religion but also a complete comprehensive, dynamic and scientific code of life. ইসলাম হলো পরিপূর্ণ জীবনদর্শন ও জীবনবিধান। যে শিক্ষাব্যবস্থায় ইসলামকে একটি পরিপূর্ণ জীবনাদর্শ হিসেবে শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকে তাই নৈতিক শিক্ষা। অর্থাৎ- জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় আল কুরআন ও আল হাদীসের আলোকে যাবতীয় শিক্ষা দেওয়া।
যে শিক্ষা গ্রহণ করার মাধ্যমে মুসলিম দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক, ঐতিহাসিক, চিকিৎসক, শাসক, বিচারক, গবেষক, রাজনীতিবিদ, ভূগোলবিদ, রসায়নবিদ, অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, সেনাপ্রধান, রাষ্ট্রদূত, সরকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারী ইত্যাদি সৃষ্টি হবে। আধুনিক বিশ্বে ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষাকে মানবজাতির মুক্তির বিধানরূপে পেশ করার যোগ্যতা সম্পন্ন লোক তৈরি করতে হলে জ্ঞান বিজ্ঞানের সকল দিকের শিক্ষা এবং সাহিত্যে ইসলাম, নৈতিকতা মূল্যবোধের প্রাধান্য দিতে হবে।
বর্তমানে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় যে ধরনের ইসলামী দর্শন চর্চা চলে তা দিয়ে কিছুটা নৈতিকতা সৃষ্টি হলেও পূর্ণাঙ্গ নয়। স্কুল পর্যায়ে ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা নামের একটি বিষয় নির্ধারিত থাকলে ও কলেজ পর্যায়ে তা অতিরিক্ত বিষয়। তাও আবার সে অতিরিক্ত বিষয়টি শুধু মানবিক বিভাগের জন্য নির্ধারিত। বিজ্ঞান ও ব্যবসা বিভাগে কলেজ পর্যায়ে ইসলাম চর্চা হয় না বললেই চলে।
এখন যতই প্রচেষ্টা চালাই আদর্শিক শিক্ষার জন্য তা কখনোই  সম্ভব নয়। দেশে এখন ইসলাম এমন পর্যায়  আছে যা একটি উদাহরণ দিলেই আমরা বুঝতে পারব। একলোক বিবাহের জন্য একটি পায়জামা ক্রয় করল এবং বাড়িতে এসে দেখল পায়জামা বড় হচ্ছে, তখন সে মাকে বলল, তার পায়জামা বড় যেন একটু কমিয়ে দেয়। আবার লোকটি বোনকে এবং ভাবীকেও পায়জামা কমিয়ে দিতে বললো। পরে দেখা গেল প্রথমে মা কমালো তারপর বোনে কমালো, ভাবীও কমালো। এভাবে লোকটি পরবর্তীতে পায়জামা পরতে গিয়ে দেখে শর্ট পায়জামা হয়ে গেল। ইসলাম ও আজ কমতে কমতে শর্ট হয়ে গেছে। আমরা যে ইসলামের চর্চা করি তা নামে মাত্র এর চেয়ে বেশী কিছু নয়।
একজন মুসলমানের ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে জীবনের সর্বস্তরে আল্লাহর বিধিবিধান মেনে নেওয়া ও তার সন্তুষ্টি অর্জন করাই হলো ইসলামি শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য। মূলত ইসলামি শিক্ষার মূল ভিত্তি হলো- তাওহীদ, রিসালাত, আখিরাত। যার মাঝে পরকালের ভয় থাকে তার দ্বারা খারাপ কাজ হতে পারে না। তাই এমনভাবে শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা উচিত, যা গ্রহণ করলে একজন ব্যক্তি দীন ও দুনিয়ার  প্রয়োজন মেটাতে পারে এবং সেটাই হবে ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা।
নৈতিকতা : নৈতিকতা বলতে আমরা বুঝি নীতির অনুশীলন, নীতির চর্চা। নৈতিকতার ইংরেজি শব্দ Morality যার উৎপত্তি হয়েছে ল্যাটিন শব্দ Moralitas থেকে। Moralitas অর্থ হলো- ধরন, ভালো আচরণ, চরিত্র প্রভৃতি। কাজেই নৈতিকতা হলো এমন এক বিধান যার আলোকে মানুষ তার বিবেকবোধ ও ন্যায়বোধ ধারণ ও প্রয়োগ করতে পারে।
সততা, সদাচার সৌজন্যমূলক আচরণ সুন্দর স্বভাব মিষ্টি কথা ও উন্নত চরিত্র এ সবকিছুর সমন্বয় হলো নৈতিকতা। একজন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের চাল-চলন, ওঠা-বসা, খাওয়া-দাওয়া, আচার-ব্যবহার, লেন-দেন সবকিছুই যখন প্রশংসনীয় ও গ্রহণযোগ্য হয় তখন তাকে নৈতিক গুণাবলী সম্পন্ন ব্যক্তি বলে। তাই নৈতিকতা সম্পন্ন ব্যক্তিকে রাসুলুল্লাহ (স:) সর্বোত্তম ব্যক্তি বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন ‘‘নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি উত্তম যার চরিত্র উত্তম” (বুখারী ও মুসলিম)
রাসুল (সঃ) আরো বলেন- মুমিনের পরিমাপদণ্ডে কিয়ামতের দিন উত্তম নৈতিক চরিত্র অপেক্ষা অধিক ভারী জিনিস আর কিছু নয়।” (তিরমিযী)
নৈতিকতা হলো ব্যক্তির মৌলিক মানবীয় গুণ এবং জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। যা অর্জন করলে তার জীবন সুন্দর ও উন্নত হয়। আর এর মাধ্যমে সে অর্জন করে সম্মান ও মর্যাদা। ইসলামি শিক্ষার  অন্যতম উদ্দেশ্য হলো- মানুষকে নৈতিকতা শিক্ষা দেওয়া। নীতিহীন মানুষ চতুষ্পদ জন্তুর চেয়েও নিকৃষ্ট। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন-তাদের হৃদয় আছে উপলব্ধি করে না, চোখ আছে দেখে না, কান আছে শুনে না। এরা হলো চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায়। বরং তার চেয়েও নিকৃষ্ট । আর এরাই হলো গাফিল। (সূরা আরাফ, আয়াত-১৭৯)। বস্তুত নৈতিকতা হলো মানুষের সবচেয়ে উন্নত গুণ ও বৈশিষ্ট্য।
Cambridge International Dictionary of English অনুসারে নৈতিকতা হলো একটি গুণ, যা ভালো আচরণ বা মন্দ আচরণ, স্বচ্ছতা, সততা ইত্যাদির সাথে সম্পর্কযুক্ত। একে সবাই আইন বা অন্য কোন বিষয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে।
নৈতিকতার সংকট এবং অবক্ষয়: অবক্ষয় শব্দের অর্থ ‘ক্ষয়প্রাপ্তি’। নৈতিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধ তথা সততা, কর্তব্য, নিষ্ঠা, ধর্ম, উদারতা, শিষ্টাচার, সৌজন্যবোধ, নিয়মানুবর্তিতা, অধ্যবসায়, নান্দনিক সৃজনশীলতা, দেশপ্রেম, কল্যাণবোধ ,পারস্পরিক মমত্ববোধ ইত্যাদি নৈতিক গুণ লোপ পাওয়া বা নষ্ট হয়ে যাওয়াকে বলে সামাজিক অবক্ষয়। এটি হলো সামাজিক মূল্যবোধের বিপরীত স্রোতধারা। নৈতিকতা ও আদর্শিক শিক্ষার অভাবই সামাজিক অবক্ষয়ের কারণ। সাম্প্রতিক বছর গুলোতে সামাজিক অবক্ষয়জনিত কারণে সৃষ্ট ও বিস্তৃত সামাজিক অপরাধ বেড়েছে বহু গুণ। পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকসহ সকলক্ষেত্রে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় পরিলক্ষিত হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে অশনিসংকেত।
নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে মানুষের হৃদয়বৃত্তিতে ঘটছে অনাক্সিক্ষত পরিবর্তন। পরিণতিতে সমাজ ও পরিবারে বেজে উঠছে ভাঙনের সুর। নষ্ট হচ্ছে পবিত্র সম্পর্ক গুলো। চাওয়া পাওয়ার ব্যবধান হয়ে যাচ্ছে অনেক বেশি। ফলে বেড়ে চলছে আত্মহত্যা, হত্যাসহ অন্যান্য অপরাধ প্রবণতা। মা-বাবা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সম্পর্কের এমন নির্ভেজাল  জায়গাগুলোতে ফাটল ধরেছে। ঢুকে পড়েছে  অবিশ্বাস। আর এর ফলে স্বামী-স্ত্রীর প্রেমময় সম্পর্কে সৃষ্টি হচ্ছে আস্থার সংকট। ক্ষেত্রবিশেষ বলি হচ্ছে নড়ি ছেড়া ধনসম্পত্তির মত সন্তান-সন্ততি। ফলে সমাজ থেকে হারিয়ে  যাচ্ছে সুখ-শান্তি। যদিও পরিবারকে মানবজাতির প্রাথমিক শিক্ষালয়  বলা হতো, কিন্তু সে অবস্থানে এখন আর পরিবারগুলো নেই।
উপর্যুক্ত জীবন দর্শনের অভাবে পরিবারগুলো এখন ভোগ-বিলাস, অর্থনৈতিক অতি উচ্চাকাক্সক্ষা, পরশ্রীকাতরতার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। আত্মকেন্দ্রিকতা ও স্বার্থপরতার প্রতিযোগিতায় জন্ম নিচ্ছে গা শিউরে ওঠার মতো ঘটনা। ধনবাদী ধ্যান-ধারণায় গড়ে উঠেছে ভারসাম্যহীন সমাজ।
 অবক্ষয়ী এ সমাজব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে দেশের ভবিষ্যত যুবসমাজ। নৈতিকতাহীন শিক্ষায় তারা দূরে সরে যাচ্ছে পরিপূর্ণ মানুষ হওয়া থেকে। আর হয়ে যাচ্ছে বখাটে, মাদকাসক্ত, ধর্ষক, ইভটিজার, সন্ত্রাসী, দুর্নীতিবাজ, সুদখোর ও ঘুষখোর। এতে সমাজ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ন্যায়নীতি  ও ন্যায়বিচার। স্যাটেলাইটের সুবাদে উন্মুক্ত অপসংস্কৃতির দাপটে হারিয়ে যাচ্ছে চিরায়ত দেশীয় সংস্কৃতি। মোবাইলে ইন্টারনেট চালানো সহজ হওয়ায় যুবসমাজ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এমনকি শিশুরাও ধ্বংসের দিকে  চলে যাচ্ছে। প্রযুক্তির অপব্যবহার কল্যাণের নামে অকল্যাণে বয়ে আনছে। ফলে নৈতিক শিক্ষার অভাবে জাতি আজ এক সর্বগ্রাসী অবক্ষয়ের কবলে পড়ছে।
সমাধানের উপায়: দেশে ভয়াবহ ব্যাধির মত দানা বাঁধছে নৈতিক ও সামজিক অবক্ষয়। সমাজ বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এখন থেকে এর লাগাম টেনে ধরতে না পারলে আগামী বছরগুলোতে খুব অল্প সময়ের মধ্যে ভয়াবহ রূপ নেবে সামাজিক অবক্ষয়। প্রতিদিন একটু একটু করে অবক্ষয়ের অতল অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে দেশ। ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা সর্বক্ষেত্রে অন্তর্ভূক্ত করা সময়ের দাবি হয়ে উঠছে। শিক্ষার সর্বস্তরে ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটানো উচিত বলে আমি মনে করি।
তাহলে হয়তো আমরা সভ্য জাতি হিসেবে বিশ্বে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবো। যার জন্য প্রয়োজন কিছু পদক্ষেপ-
*    ধর্মীয় শিক্ষাকে জাগিয়ে তোলা উচিত।
*    ইসলামের সঠিক শিক্ষার প্রয়োগ থাকা প্রয়োজন।
*    নৈতিক শিক্ষার আলোকে জাতিকে গড়ে তোলা প্রয়োজন।
*    অপসংস্কৃতির উন্মুক্ত আগ্রাসন রোধকল্পে আইনি ও সামাজিক পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
*    সামাজিক অনুশাসন জোরদার করা উচিত।
*    আদর্শিক পরিবার গড়ে তোলা উচিত।
*    পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করা উচিত।
*    বিপরীত লিঙ্গের প্রতি যথাযথ সম্মান ও শ্রদ্ধার মানসিকতা থাকা উচিত।
*    প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
*    মিডিয়া ও গণমাধ্যমকে ন্যায়-নীতি ও আদর্শের পথে ধাবিতকরণে উৎসাহিত করা উচিত।
*    দুর্নীতিবাজ ও ঘুষখোর রোধে রাষ্ট্রীয়ভাবে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
*    পক্ষ ও বিপক্ষের খোলস ছেড়ে সত্য বলার মানসিকতা থাকা উচিত।
*    আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা দরকার।
*    সর্বক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ভূমিকা থাকতে হবে।
এভাবে সার্বিক পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হবে নৈতিক ও মূল্যবোধের শিক্ষায় আলোকিত এক পরিচ্ছন্ন সমাজ ও দেশ। আসুন জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সব মতপার্থক্য ভুলে সুন্দর একটি জাতি গড়ি। যে জাতি উপহার দেবে সুন্দর একটি সমাজ ও দেশ।